উদ্যোক্তা হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই আপনি সময়ে সময়েই আপনার বিজনেসের উপার্জন বাড়াতে চাইবেন। কতিপয় উদ্যোক্তা একদম শুরু থেকেই অত্যন্ত অনেক ভালো রোজগার করেন, কেউবা একটু টাইম নিয়ে সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেন। কতিপয় উদ্যোক্তার ইনকামের হার সময়ের সাথে বাড়তে থাকে, কারওবা একটা জায়গায় এসে থমকে যায় – বাড়েও না আবার কমেও না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাঁদের ইনকাম বাড়ে, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে কি করেন? কি এমন জাদু জানেন তাঁরা যে, অন্যরা যখন থেমে রয়েছে বা পিছিয়ে যাচ্ছে – অথচ তাঁদের এ্যাকাউন্ট শুধুই ফুলে ফেঁপে উঠছে?
আলিবাবার জ্যাক মা অথবা আমাজন এর জেফ বেজোস এর মত বিশ্বসেরা সাকসেসফুল উদ্যোক্তাদের কথা কথা নাহয় বাদই দিলাম, আমাদের আশেপাশে তাকালেও এইরকম উদ্যোক্তা লক্ষ্য করা যায়, যাঁরা দেখার মত কিছু না করেও ঠিকই ব্যবসায় ভালো লাভ করেন।
এটা আসলে অত্যন্ত কঠিন বা আশ্চর্যজনক কিছু নয়। যেসব উদ্যোক্তা অন্যদের চেয়ে ব্যবসা থেকে বহু রোজগার করেন, তাঁরা কয়েকটি নির্দিষ্ট অভ্যাসের চর্চা করেন। কেউ হয়তো জেনে করেন, কেউ সম্ভবত এগুলোর উপকারিতা না জেনেই চর্চা করেন। তবুও দুই দলই সমান ভাবে লাভবান হন।
আজ আমি আলোচনা করবো- সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে, তা নিয়ে

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

সূর্যোদয়ের শুরুতে দিনের কাজ আরম্ভ করুন
বিচক্ষণ উদ্যোক্তা এবং সাকসেসফুল ব্যক্তিদের সেরা অভ্যাস হচ্ছে সকালে নিদ্রা থেকে ওঠা। এটি শুধুমাত্র আপনার স্বাস্থ্যেরই উন্নতি করবে না বরং একটা সুন্দর সকাল একটি উৎপাদনশীল দিনের আবির্ভাব ঘটাবে ।

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

প্রতিদিন নিয়ম করে বই পড়ুন
বিচক্ষণ উদ্যোক্তা এবং সফল ব্যক্তিদের আরেকটি সেরা হ্যাবিট হচ্ছে রেগুলার বই পড়া। তবে বইগুলো গল্প-কবিতার বই না হয়ে প্রাসঙ্গিক বই হওয়া চাই। আপনি যে কাজে বা ব্যবসায় নিযুক্ত তাতে যদি আপনার গভীর নলেজ থাকে তা আপনাকে ওপরের উঠতে হেল্প করবে। সাম্প্রতিক সময়ের বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ থেকে আরম্ভ করে প্রায় সফল ব্যক্তিদের এটি নিয়মিত অভ্যাস। উদ্যোক্তাদের বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরেক একটি পোস্ট লিখব। কিন্তু এইখানে একজন বাঙালি সফল উদ্যোক্তার কথা বলে আজকের লেখা সম্পন্ন করি। তিনি হলেন রুসেল সরদার। আইটি ট্রেনিং সংগঠন NetCom Learning-এর কর্ণধার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেরা সফল আইটি ট্রেনিং কোম্পানি, যাদের সেলস ১০ মিলিয়ন ডলারেরও ওপরে। উনি বলেন, বিজনেস নিয়ে যত ব্যস্ত থাকেন না কেন, প্রতিদিন নিয়ম করে বই পড়েন। সপ্তাহের কাজের দিনগুলো ১-২ ঘণ্টা এবং বন্ধের দিনগুলো ৮-১০ ঘণ্টা উনি বই পড়েন।
তার সুপারিশকৃত তিনটি বই, The Five Dysfunctions of a Team-এই বইটি তার দলকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কাজ করার পরিচালনা সহযোগিতা করেছে। The Four Kinds of Sales People-এই বইটি তাকে তার বিক্রয় থেকে মন্দ লোকদের বাতিল দেওয়ার জন্য হেল্প করেছে। Good to Great-এই বইটি তার সংগঠন পরিচালনার চিন্তাগুলোকে যাচাই করতে সাহায্য করেছে।

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন
নিজের টার্গেট ঠিক করাকে প্রতিদিনের কর্তব্য মনে করুন। প্রতিদিনে, মাসে, বছরে, এমনকি এক দশকে আপনি কী অর্জন করতে চান তা লিখে ফেলুন। এমনটি আপনাকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখবে এবং সুবিশাল কয়েকটি ভাবনা করতে হেল্প করবে যার মাধ্যমে আপনি ছোট সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবেন। আপনি যদি টার্গেট অর্জন করতে চান, তাহলে আপনার টার্গেটের সাথে সংগতিপূর্ণ কয়েকটি বাসনা লিপিবদ্ধ করুন। উদাহরণসরূপ পরের ১০ বছরে আপনার একটি চমৎকার বাড়ি, ১টি অনেক ভালো গাড়ি, পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট থাকবে। যদি এরূপ ধারণাগুলো আপনার ভিতরে নিয়ে আসতে পারেন তাহলে এটা আপনাকে আপনার জীবনের গতি সম্মন্ধে উজ্জীবিত করবে। যদি পরের ১০ বছরের জীবনকে আপনি বর্তমানে দেখতে পারেন, তবে আপনি সেটি করতে পারবেন।

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন
সিদ্ধান্ত যত ভেবেচিন্তে নেওয়া হোক না কেন, আসল ব্যপার হচ্ছে তার বাস্তবায়ন। এই কারণে সফল উদ্যোক্তাগণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কারণ সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে কোনো ভালো সিদ্ধান্তও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। আবার আপাতদৃষ্টিতে ভুল বলে মনে হওয়া ডিসিশন থেকেও ভালো রেজাল্ট আসতে পারে।

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

ইউনিক হোন
যেসব উদ্যোক্তা গতানুগতিক বিজনেস করেন – তারা বেশিরভাগ সময়েই একটা জায়গায় এসে আটকে যান। আর্থিক অবস্থা এক রকম ভাবে চলতে থাকেন। তাঁরা হয়তো-বা রেগুলার রোজগার করেন – তা সত্ত্বেও রোজগারের হার বৃদ্ধি পায় না।

বিশ্বখ্যাত অনলাইন আদান-প্রদান প্রতিষ্ঠান পে-পাল এর সহপ্রতিষ্ঠাতা পিটার থেইল তাঁর বেস্ট সেলিং বই জিরো টু ওয়ান – এ লিখেছেন, কোনও ব্যবসাকে যদি সর্বোচ্চ অবস্থায় সাকসেস হতে হয়, তাহলে নিশ্চয়ই তার মধ্যে এইরকম কিছু থাকতে হবে – যা এর পূর্বে কেউ করেনি।

আপনি যখন পুরোপুরি ইউনিক কোনও প্ল্যান নিয়ে কাজ করবেন, কিংবা চলমান কোনও ব্যবসায় ইউনিক কিছু নিয়ে আসবেন – তখন আপনার পন্য বা সার্ভিস নেয়ার জন্য মানুষের উৎসাহ বেশি থাকবে।

ব্যাপারটা এইরকম নয় যে আপনাকে একদম নিউ প্ল্যান নিয়েই মাঠে নামতে হবে। চলমান ব্যবসাতেও নতুন নিউ আইডিয়া যোগ করে তাকে মানুষের চোখে ইউনিক বানানো যায়। আমাজন ডট কম এর কথাই ধরুন, এটি প্রকৃতপক্ষে একটা খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। খুচরা দোকানের আইডিয়াকেই অন লাইনে এনে জেফ বেজোস আজ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী।আপনার যদি ১টি দোকান থাকে, আপনি দোকানের ডিজাইনে একটু পরিবর্তন এনেই কিন্তু অন্যদের চেয়ে প্রচুর বেশি বায়ার আকৃষ্ট করতে পারেন। ওয়ালমার্ট এর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটন তাঁর পাশের দোকানের সাথে প্রতিযোগীতায় এগিয়ে থাকার জন্য তাঁর নিজের দোকানের সামনে ১টি পপকর্ণ ও ১টি আইসক্রিমের গাড়ি বসিয়ে দিয়েছিলেন। এই দু’টি গাড়ির বিক্রী থেকে যদিও তাঁর খুব একটা লাভ হত না – তা সত্ত্বেও এগুলোর কারণে তাঁর দোকানের সামনে বহু বায়ার আসতো। ফলে তাঁর দোকানের বিক্রী বেড়ে যাচ্ছিল।

নিজের বিজনেসের বিক্রী বাড়ানোর জন্য জন্য সব সময়েই এইরকম আইডিয়ার কথা ভাবতে থাকুন, যেগুলো সরাসরি আপনার পন্যের সাথে সম্পৃক্ত না হলেও বায়ার মুগ্ধ করে। প্রচুর রেস্টুরেন্টেই দেখতে পারবেন বাচ্চাদের খেলার জন্য আলাদা স্থান করা থাকে। এটা রেস্টুরেন্টের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও – এর ফলে রেস্টুরেন্টে ক্রেতা আসার পরিমান বাড়ে, ফলে আয়ও বৃদ্ধি পায়।

আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের এরূপ কোনও সমস্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন, যেটার ঠিক সমাধান ওদ্যাবধি পর্যন্ত কেউ করেনি। দীর্ঘ মেয়াদে বিজনেসের রোজগারের হার বৃদ্ধির জন্য জন্য এটি খুবই চমৎকার ১টি উপায়।সব সময়ে কম্পিটিটদের দিকে নজর রাখুন। তারা কি করছে – তা দেখার পাশাপাশি, তারা কি করছে না – এটিও বোঝার ট্রাই করুন। নিজেকে যত অনন্য ভাবে তুলে ধরতে পারবেন – ততই অধিক ক্রেতা আপনার প্রতি প্রলুব্ধ হবে।

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

টাইম ম্যানেজমেন্ট
মানুষের জীবনে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু হল সময়। জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রেই সময়ের ভ্যালু যতটা, ততটা ভ্যালু কোনওকিছুরই নেই। ব্যবসার ক্ষেত্রে এ কথাটা একরকম চমৎকার করে খাটে।
যে কোনও সফল উদ্যোক্তাই দারুন ভাবে টাইম ম্যানেজমেন্ট করেন। তাঁরা জানেন যে বিজনেস একমাত্র তখনই অগ্রগতি করবে, যখন তাঁরা সময়ের কাজ সময়ে করবেন। টাইমলি ক্রেতাদের ডিমান্ড পূরণ করবেন।
আপনার সার্ভিস বা পন্য গ্রহণ করার জন্য যদি ক্রেতাদের অধিক সময় অপেক্ষা করতে হয়, তবে তাঁরা বিরক্ত হয়ে অন্যজনের কাছে যাবেন। ২ দিনে ডেলিভারি দেয়ার কথা বলা হয় যদি ৫ দিন লাগান – সেটা কোনও ক্রেতাই বেশ ভালো চোখে দেখবেন না। এতে করে মার্কেটে আপনার খ্যাতি নষ্ট হবে। গ্রাহক বাড়ার বদলে দিনে দিনে কমতে থাকবে। অন্যদিকে যদি বিজনেসের সকল কাজ সময়মত করেন, তবে তা বাজারে আপনার সুনাম তৈরি করবে। নতুন নতুন গ্রাহক আপনার পন্য বা পরিসেবা নিতে আগ্রহী হবে। কারণ, আপনার চমৎকার টাইম ম্যানেজমেন্টের কারণে পুরাতন ক্রেতারাই নতুন ক্রেতার নিকট আপনাকে রিকমেন্ড করবেন। আর ক্রয়কারী বাড়া মানেই আপনার আয় বাড়া।

সফল উদ্যোক্তাদের যে ৭টি অভ্যাস আপনাকে বেশি আয় করতে সাহায্য করবে

টেকনোলজির ব্যবহার
আপনি যখন কোন প্রতিষ্ঠানের সিইও, সেই সময় আপনার প্রতিদিনের কাজ সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখার প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে তাদের জন্য এটি বাঞ্চনীয় যারা একইসাথে অনেকগুলো ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাদের জন্যে টু ডু একটি তালিকা থাকা খুবই প্রয়োজন।
ভক্স মোবাইলের সিইও ক্রিস স্নাইডার তার কোম্পানির বাৎসরিক ইনকাম ৩০% বাড়িয়েছেন। সেইম সঙ্গে তিনি “Gartner’s MMS Magic Quadrant” এই তার কোম্পানিকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। সেইম সঙ্গে তিনি Global Enterprise Mobility Alliance (GEMA) এর প্রতিষ্ঠাতা।
স্নাইডার বলেন, তার সফলতার পেছনে দায়ী ছিলো তার গোছানো কাজ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের কৌশলগুলোকে সাজানো। তার ওপর টেকনোলজির এইরকম ইফেক্ট ছিলো যে, তিনি তাদের কাজ এবং মিটিংয়ের সময়সূচি করতে PRM Tool ব্যবহার করতেন। এটি তার পারিবারিক রিলেশন ও কাজের সম্পর্ক দুটোকে ব্যলেন্স করতে প্রচুর অবদান রাখে।

অভ্যাস আমাদের জীবনযাপনের ধরনে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুসন্ধানে লক্ষ্য করা গিয়েছে, আমরা ডেইলি যা যা করি তার ৪৫% আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসের কারণে। আপনি যদি সফল উদ্যোক্তা হওয়ার উপরের বৈশিষ্ট্য গুলো মেনে চলেন, ইন শা আল্লাহ্‌ একদিন আপনিও পারবেন উদ্যোক্তাজীবনে সফল হতে । সেই সাথে আরেকটি কথা বলে রাখি , অবশ্যই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবেন । সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করবেন ।

তো কেমন লাগলো আমাদের আজকের লেখাটি পড়ে ?

Newsletter